স্টকহোম: ইউরোপের নতুন পুঁজির রাজধানী

স্টকহোম, সুইডেন — বহু দশক ধরে ইউরোপের আর্থিক শক্তির প্রতীক ছিল লন্ডন, প্যারিস কিংবা ফ্রাঙ্কফুর্ট। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিনিয়োগের মানচিত্রে দ্রুত উত্থান ঘটেছে উত্তর ইউরোপের একটি শহরের— স্টকহোম। প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে স্টকহোমকে “ইউরোপের নতুন পুঁজির রাজধানী” বলে উল্লেখ করেছে।

এই মূল্যায়ন কেবল প্রতীকী নয়; পরিসংখ্যানও একই গল্প বলছে।

প্রায় এক কোটি মানুষের দেশ সুইডেনে মাথাপিছু ইউনিকর্ন স্টার্টআপের হার ইউরোপে সর্বোচ্চ। এক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের কোম্পানিকে ইউনিকর্ন বলা হয়। এই তালিকায় রয়েছে মিউজিক স্ট্রিমিং জায়ান্ট স্পটিফাই, পেমেন্ট ও “বাই নাও, পে লেটার” প্ল্যাটফর্ম ক্লারনা, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী ট্রাস্টলি  এবং কার্ড রিডার কোম্পানি আইজেটল—যেটি পরে পেপাল অধিগ্রহণ করে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রথম প্রজন্মের এই উদ্যোক্তারা এখন নতুন স্টার্টআপে বিনিয়োগ ও পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উদ্যোক্তা চক্র তৈরি হয়েছে, যাকে অনেকে “স্পটিফাই মাফিয়া” বলে আখ্যা দেন।

২০২৪ সালে সুইডিশ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ইউরো ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংগ্রহ করেছে, যা ইউরোপে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে স্থান করে দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিনিয়োগগুলোর একটি গেছে স্টেগ্রা-র কাছে (আগের নাম এইচটু গ্রীন স্টিল)। সবুজ ইস্পাত উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বিলিয়ন ইউরোর অর্থায়ন নিশ্চিত করেছে, যা ইউরোপের ক্লাইমেট টেক খাতে অন্যতম বড় ফান্ডিং হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এছাড়া স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং শক্তি খাতেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এসেছে। স্পটিফাইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল একের স্বাস্থ্য প্রযুক্তি উদ্যোগও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য তহবিল সংগ্রহ করেছে।

স্টকহোম এখন ইউরোপের অন্যতম ঘন ফিনটেক হাব। শহরে ৫০০-র বেশি ফিনটেক স্টার্টআপ সক্রিয়।

সুইডেনের প্রায় নগদবিহীন অর্থনীতি এই খাতকে এগিয়ে দিয়েছে। দেশে দৈনন্দিন লেনদেনের খুবই সামান্য অংশ নগদে হয়। মোবাইল পেমেন্ট অ্যাপ সুইশ প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন লেনদেন প্রক্রিয়া করে।

ডিজিটাল অবকাঠামো, উচ্চ প্রযুক্তি গ্রহণযোগ্যতা এবং গ্রাহকদের দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা—এই তিনটি বিষয় ফিনটেক বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে।

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সুইডেনে করপোরেট ঋণ ইস্যু ও বন্ড বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। তুলনামূলকভাবে নমনীয় কাঠামো ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ স্টকহোমকে বন্ড ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।

স্টকহোমের উত্থানের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ কাজ করছে—

  • ছোট ঘরোয়া বাজার: সুইডিশ কোম্পানিগুলো শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক বাজার লক্ষ্য করে।
  • সরকারি সহায়তা: রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা সামিনভেস্ট এবং উদ্ভাবন সংস্থা ভিনোভা বেসরকারি তহবিলের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ করে।
  • দুর্বল মুদ্রা: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুইডিশ ক্রোনার দুর্বলতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্পদ তুলনামূলক সস্তা করেছে।
  • উদ্ভাবনী পরিবেশ: ইউরোপীয় কমিশনের ইইউ ইনোভেশন স্কোরবোর্ড-এ স্টকহোমকে ইউরোপের শীর্ষ উদ্ভাবনী অঞ্চলের একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সব সাফল্যের মাঝেও ঝুঁকি রয়ে গেছে। ব্যাটারি নির্মাতা নর্থভোল্ট-এর আর্থিক সংকট দেখিয়েছে, বড় ক্লাইমেট প্রকল্পে বিনিয়োগ সব সময় নিরাপদ নয়। একইভাবে, ক্লার্নার সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি বিলম্বিত হওয়াও বাজারের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়।

ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাস্তবতায় লন্ডন-এর প্রভাব কিছুটা কমেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। অন্যদিকে স্টকহোম নিজেকে প্রযুক্তি, টেকসই শিল্প এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।

স্টকহোমের অভিজ্ঞতা দেখায়—ছোট অর্থনীতিও উদ্ভাবন, নীতি সহায়তা এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বড় ভূমিকা নিতে পারে। ইউরোপে আগামী প্রজন্মের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কেন্দ্র কোথায় হবে, সেই প্রশ্নে এখন উত্তরের দিকেই নজর বাড়ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *