১৪ লাখ ইমেইলে উন্মোচিত জেফ্রি এপস্টেইনের প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক

দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইন–এর জীবন ও যোগাযোগের পরিধি নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট–এর এক বিস্তৃত অনুসন্ধানে ১৪ লাখ ইমেইল বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, কীভাবে তিনি বহু বছর ধরে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন।

গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে একটি আইন পাস হওয়ার পর প্রসিকিউটরদের ফাইল প্রকাশ বাধ্যতামূলক হয়। এরপর ৩০ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করে। বিপুল এই নথি বিশ্লেষণে একদল সফটওয়্যার প্রকৌশলী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পিডিএফ ফাইলগুলোকে অনুসন্ধানযোগ্য ফরম্যাটে রূপান্তর করেন।

দ্য ইকোনমিস্ট সেই তথ্যভাণ্ডার থেকে প্রেরক ও প্রাপকদের শনাক্ত করে শীর্ষ ৫০০ যোগাযোগকারীর পটভূমি খতিয়ে দেখে। একটি ভাষা মডেল ব্যবহার করে ইমেইল চেইনগুলোকে একটি সূচকে স্কোর করা হয়, যা দেখায় সাধারণ পাঠকের কাছে বার্তাগুলো কতটা উদ্বেগজনক মনে হতে পারে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শীর্ষ যোগাযোগকারীদের এক-তৃতীয়াংশ ছিলেন এপস্টেইনের কর্মী, সহকারী বা ব্যবসায়িক অংশীদার। তার দীর্ঘদিনের সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন সহকারী লেসলি গ্রফ, হিসাবরক্ষক রিচার্ড কান এবং পাইলট ল্যারি ভিসোস্কি।

তবে বাকি অংশে উঠে এসেছে বিস্তৃত এক নেটওয়ার্ক। শীর্ষ ৫০০ জনের মধ্যে— ১৯% বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতিবিদ, ১০% বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক, ৮% গণমাধ্যম ও বিনোদন জগতের ব্যক্তি, ৭% প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধি, ৬% আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও একাডেমিক, ৫% বৃহৎ সম্পত্তির মালিক।

এপস্টেইনের স্টাফ নয় এমন যোগাযোগকারীদের এক-চতুর্থাংশের নিজস্ব উইকিপিডিয়া পৃষ্ঠা রয়েছে। তিনি অন্তত ১৮ জন বর্তমান বা সাবেক বিলিয়নেয়ারের সঙ্গে ইমেইল বিনিময় করেছেন। তাদের মধ্যে আছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক ও পিটার থিয়েল।

বিনোদন জগতের উডি এলেন এবং লেখক দীপক চোপড়া–এর সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। রাজনৈতিক মহলে তার যোগাযোগের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইহুদ বারাক।

সবচেয়ে আলোচিত যোগাযোগ ছিল মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস–এর সঙ্গে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এপস্টেইন গেটসকে বহু ইমেইল পাঠিয়েছিলেন, যদিও গেটসের জবাব ছিল তুলনামূলক কম। তবু বিভিন্ন সময়ে তাদের সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

কিছু সম্পর্ক ছিল নিয়মিত ও ঘনিষ্ঠ। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা–এর হোয়াইট হাউস কাউন্সেল ক্যাথরিন রুমলার ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এপস্টেইনের সঙ্গে ১১ হাজারের বেশি ইমেইল বিনিময় করেছেন।

ব্যাংকার আরিয়ান ডি রথসচাইল্ড ও সাবেক ট্রেজারি সেক্রেটারি ল্যারি সামার্সের সঙ্গেও হাজার হাজার ইমেইল লেনদেন হয়েছে। ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি এবং তার পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল।

ইমেইলের একটি অংশে ব্যক্তিগত ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তার উল্লেখ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নগ্ন ছবি চাওয়া বা গোপন যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে এই নথি প্রকাশ সত্ত্বেও বেশ কিছু প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। ২০০৮ সালে এপস্টেইন কীভাবে একটি বিতর্কিত চুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলক হালকা শাস্তি পেয়েছিলেন, বা কঠোর নজরদারির মধ্যেও ২০১৯ সালে জেলে তার মৃত্যু কীভাবে ঘটেছিল—এসব বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

ইমেইল ফাঁসের পর কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির অবস্থান নড়বড়ে হয়েছে। কেউ কেউ পদত্যাগ করেছেন, আবার কেউ সম্পর্কের জন্য প্রকাশ্যে অনুশোচনা জানিয়েছেন।

এপস্টেইনের মৃত্যু হলেও তার নেটওয়ার্ক নিয়ে অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। প্রকাশিত ইমেইলগুলো দেখায়, কীভাবে ক্ষমতা, অর্থ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিল জাল বহু বছর ধরে অদৃশ্যভাবে বিস্তৃত ছিল। তদন্তকারীরা মনে করছেন, সামনে আরও তথ্য প্রকাশ পেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *