ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন— ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সর্বোচ্চ নেতার সম্মানে ইরান ৪০ দিনের জাতীয় শোক এবং ৭ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে।
শনিবার ভোরে তেহরানে তাঁর বাসভবন কমপাউন্ড ‘বেইত-এ রাহবারি’ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় বলে ইসরায়েলি সামরিক সূত্র জানায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেন, হামলায় “গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু” ধ্বংস হয়েছে। পরে দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, খামেনেই নিহত হয়েছেন বলে তাদের কাছে তথ্য আছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির জানান, ইরানজুড়ে “শত শত লক্ষ্যবস্তুতে” আঘাত হানা হয়েছে। লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সামরিক স্থাপনা, কমান্ড সেন্টার এবং নিরাপত্তা সংস্থার অবকাঠামো ছিল বলে দাবি করা হয়।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আরও দাবি করেন, হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। গতকালের হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনির উপদেষ্টা অ্যাডমিরাল শামখানি এবং আইআরজিসির কমান্ডার মেজর জেনারেল পাকপুরের মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে ইরানিয়ান টেলিভিশন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক ভিডিও বার্তায় ইরানি জনগণকে তাদের “ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে নেওয়ার” আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি খামেনেইকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন এবং হামলাকে “ন্যায়বিচারের পদক্ষেপ” হিসেবে বর্ণনা করেন।
হোয়াইট হাউস জানায়, কংগ্রেসের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে আগেই ব্রিফ করা হয়েছিল। তবে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সমালোচনা করেছেন।
তেহরানের কিছু এলাকায় হামলার পর উল্লাসের খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা যায়। তবে একই সময়ে দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনাগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে বলে জানায় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। ইরানের দাবি, এসব হামলায় অন্তত ২০১ জন নিহত এবং শত শত আহত হয়েছেন। ইসরায়েলের জরুরি সেবা সংস্থা জানায়, তেল আবিব এলাকায় রকেট আঘাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন।
খামেনেই ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে বিশেষজ্ঞ পরিষদ—৮৮ জন ধর্মীয় পণ্ডিতের একটি সংস্থা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য এখন বড় প্রশ্ন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কি সরাসরি প্রভাব বাড়াবে, নাকি বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব নতুন সমঝোতার পথে হাঁটবে—তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের ওপর।
পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় দেশগুলো সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জরুরি বৈঠক ডাকছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে উত্তেজনা চরমে। তেল বাজার অস্থির। আঞ্চলিক মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে।