প্রায় চার দশক ধরে ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই আর নেই। মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ৮৬ বছর বয়সী এই সর্বোচ্চ নেতা ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদ শূন্য হলো। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি-র মৃত্যুর পর খামেনেই ক্ষমতায় আসেন এবং দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা বাহিনী—বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)—এর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু বা পদত্যাগের পর ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞদের পরিষদ নতুন নেতা নির্বাচন করে। এই পরিষদ ইসলামি ধর্মীয় পণ্ডিতদের নিয়ে গঠিত এবং তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
তবে সাম্প্রতিক হামলায় সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এতে করে নির্বাচন প্রক্রিয়া কত দ্রুত এবং কতটা স্থিতিশীলভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
খামেনেইর মৃত্যুর আগে তিনজন শীর্ষ ধর্মীয় পণ্ডিতকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র জানায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে যাদের নাম বেশি আলোচিত—
মোজতবা খামেনেই — খামেনেইর দ্বিতীয় পুত্র। দীর্ঘদিন ধরে তাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়। নিরাপত্তা বাহিনী ও আইআরজিসির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে ইরানের ভেতরে আপত্তিও আছে।
সাদিক লারিজানি — প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ও খামেনেইর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। বিচার বিভাগে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। সাম্প্রতিক সংকটে তাকে একটি সমঝোতার প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মোহাম্মদ মিরবাগেরি ও মোহসেন আরাকি — কঠোরপন্থী শিবিরে প্রভাবশালী দুই ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তারাও সম্ভাব্য তালিকায় আছেন।
অন্যদিকে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতার পৌত্র হাসান খোমেনি-র নামও মাঝে মাঝে আলোচনায় আসে। তবে অতীতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন সতর্ক করেছে, ক্ষমতার এই শূন্যতায় আইআরজিসি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, বেসামরিক কাঠামো বজায় থাকলেও বাস্তবে সামরিক নেতৃত্বের প্রভাব অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ভিডিও ভাষণে ইরানি জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, হামলার সময় নিরাপদে থাকতে এবং পরে “দেশের ভবিষ্যৎ নিজেদের হাতে নেওয়ার” প্রস্তুতি রাখতে।
নির্বাসিত ইরানি রাজপরিবারের সদস্য রেজা পাহলাভি-ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের ভবিষ্যৎ এখন দুই সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে, বিশেষজ্ঞদের পরিষদ দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে। অন্যদিকে, ক্ষমতার লড়াই দীর্ঘ হলে নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতর থেকেই নতুন শক্তির উত্থান ঘটতে পারে।
যে পথই সামনে আসুক, এই পরিবর্তন শুধু ইরানের ভেতরেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে—এমনটাই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।