এক চিমটি ভালোবাসা আর একমুঠো ইফতার: ‘হাত বাড়িয়ে দাও’ ফাউন্ডেশনের এক দশক

মানুষ কি কেবল নিজের জন্যই জন্মায়? মা বলতেন, “বাবা, মানুষ হ।” তখন বুঝিনি। আজ পশ্চিম আগারগাঁওয়ের ৪৫ নম্বর বাড়ির আঙিনায় যখন একঝাঁক সুবিধাবঞ্চিত শিশুর হাসিমুখ দেখলাম, তখন মনে হলো—মানুষ হওয়ার মানে আসলে অন্যকে ভালোবাসতে পারা।

শনিবার (৭ মার্চ) ছিল এক অদ্ভুত মায়ার দিন। ‘হাত বাড়িয়ে দাও’ ফাউন্ডেশনের ১০ বছর পূর্তি আর পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে বসেছিল এক অন্যরকম ইফতারের আসর। আয়োজনের ভারে নুয়ে পড়া কোনো রাজকীয় ভোজ নয়, এ ছিল হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের এক পরম মিলনমেলা। যার নেপথ্যে সহযোগী হিসেবে ছিল স্বদেশ মৃত্তিকা মানব উন্নয়ন সংস্থা।

বিকেলের নরম আলোয় যখন টেবিলে ইফতারের বিতরণ হচ্ছিল, তখন চারপাশটায় এক স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতা নেমে এল। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করছিলেন ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রাণপুরুষ আনোয়ার হোসেন শিবলু। তাঁর চোখেমুখে ছিল এক দশকের তৃপ্তি। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আমজাদ সুমন যখন শুভেচ্ছা বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল কৃতজ্ঞতার সুর।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। তাঁর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক অন্য উচ্চতা পায়। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন অডিট অফিসার সাদেদেল আহমেদ, চিত্রনায়ক দেশ ইসলাম, এসইএ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমানসহ আরও অনেক গুণীজন।

মঞ্চে আরও ছিলেন মোঃ সোহাগ, ডাঃ এস এম হাবিবুর রহমান, রাজি উদ্দিন, এবং স্বদেশ মৃত্তিকা মানব উন্নয়ন সংস্থার পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সাগর। এঁদের সবার সাথে বসেছিল সেইসব শিশুরা, যাদের পৃথিবীটা হয়তো খুব ছোট, কিন্তু স্বপ্নগুলো পাহাড়ের মতো বড়। সেই শিশুদের সাথে নিয়ে ইফতার করা মানে যে কত বড় আনন্দ, তা অনুষ্ঠানে না গেলে উপলদ্ধি করতে পারতাম না।

স্বদেশ মৃত্তিকা আদর্শ বিদ্যানিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোঃ আকবর হোসেনসহ, শাহবাল আহমেদ জনি, কাজী ওয়ালিদ হোসেন, সাইদুল হক চৌধুরী, মোঃ নুরুল ইসলাম, জমশেদ আলী খান, ফিরোজ আল মামুন, ইমরান, নিবির, সাইফুল ইসলাম, তানভীর আহমেদ, ইব্রাহিম খলিল এবং জাহিদুল ইসলামের মতো একদল স্বপ্নবাজ মানুষের পদচারণায় মুখরিত ছিল পুরো আঙিনা। অনুষ্ঠানটি নিপুণভাবে সঞ্চালনা করেন ইমরান আহমেদ।

বক্তারা বলছিলেন, “সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তো আসল ইবাদত।” আসলেই তাই। এই যান্ত্রিক শহরে আমরা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, তখন একদল মানুষ ১০টি বছর পার করে দিয়েছে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টায়।

ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে যখন মোনাজাত শুরু হলো। হয়তো সেই মোনাজাতে পৃথিবীর সব দুঃখ মুছে যাওয়ার আর্জি ছিল। ইফতারের খেজুরটি মুখে দিয়ে মনে হলো, পৃথিবীতে এখনো ভালোবাসা টিকে আছে। হয়তো এই মানুষগুলো আছে বলেই পৃথিবীটা এখনো পুরোপুরি ধূসর হয়ে যায়নি।

‘হাত বাড়িয়ে দাও’ ফাউন্ডেশন তাদের এই যাত্রায় আরও বহু বছর টিকে থাকুক—অগণিত সুবিধাবঞ্চিত শিশুর আস্থার ঠিকানা হয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *