বাংলাদেশ–ভুটান বাণিজ্য বৈঠক: নতুন পণ্য, পর্যটন সহযোগিতা ও FTA সম্ভাবনা

ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের ১০ম বৈঠক। দুই দিনব্যাপী এই বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ভুটান রাজকীয় সরকার ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে এই বৈঠক ৯–১০ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। ভুটানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব তাশি ওয়াংমো। আর বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান।

২০২৪ সালে থিম্পুতে অনুষ্ঠিত ৯ম বৈঠকের পর থেকে দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় কী অগ্রগতি হয়েছে, এই বৈঠকে তার পর্যালোচনা করা হয়। আলোচনায় উঠে আসে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, পর্যটন উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজ করা, কাস্টমস পদ্ধতি, মান নির্ধারণ, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা এবং কৃষি খাতের সহযোগিতা।

দুই দেশই একমত হয়েছে, ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আরও নতুন পণ্য যুক্ত করার বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করবে। এতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বৈঠকে পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। ভুটানের পর্যটন বিভাগ এবং বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যটন খাতে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানো হবে।

পণ্য পরিবহনের সুবিধা বাড়াতে বাংলাদেশ ভুটানের জন্য পাঙ্গাঁও বন্দর ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে এবং নারায়ণগঞ্জ বন্দরের ওপর চাপ কমবে। ভুটানের প্রতিনিধিরা সরেজমিনে বন্দর পরিদর্শন করার পর বিষয়টি মূল্যায়ন করবেন।

মান ও সনদ স্বীকৃতির জন্য একটি পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এই চুক্তি হলে ভুটানের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং বাংলাদেশের বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের মধ্যে মান ও সনদের স্বীকৃতি সহজ হবে।

বৈঠকে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় একটি যৌথ বাণিজ্য কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই কমিটি বাণিজ্যসংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত সমাধান করবে এবং ভবিষ্যতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনাও এগিয়ে নেবে।

ব্যবসায়ী পর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির ফেডারেশন এবং ভুটান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ভুটানকে নিয়মিতভাবে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এতে ভুটানের পণ্যের প্রদর্শন ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে।

বৈঠকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং উপকমিটি গ্রুপটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তও হয়েছে। এর মাধ্যমে ভুটানের রপ্তানিকারকদের যে অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত সমস্যার মুখে পড়তে হয়, তা সমাধানের পথ খোঁজা হবে।

দুই দেশ ভবিষ্যতেও যৌথ কাস্টমস গ্রুপসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ফোরামে নিয়মিত বৈঠক করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাণিজ্য ও সংশ্লিষ্ট সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বৈঠকের শেষে দুই দেশের প্রতিনিধিরা দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পারস্পরিক লাভজনক বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতেও তারা প্রতিশ্রুতি জানান।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও ভুটানের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে ভুটানের জন্য বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *