রমজানের শেষ শুক্রবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক আল-কুদস দিবস। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানাতে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে প্রতিবছর এই দিনে বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তবে চলতি বছরের আল-কুদস দিবস ছিল ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে—ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার তীব্র উত্তেজনা ও চলমান সামরিক সংঘাতের ছায়ায়।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থল ফেরদৌসি স্কয়ারে হাজারো মানুষ জড়ো হন বার্ষিক আল-কুদস দিবসের মিছিলে। বিক্ষোভ চলাকালে হঠাৎ মিছিলস্থলের কাছাকাছি একটি বড় বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের শব্দে মুহূর্তের জন্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও অধিকাংশ মানুষ স্থান ত্যাগ করেননি।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বিস্ফোরণের আগে ফার্সি ভাষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই এলাকা এড়িয়ে চলার সতর্কবার্তা দিয়েছিল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরানে ইন্টারনেট সেবা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় খুব কম মানুষই সেই বার্তা দেখতে পেরেছিলেন।
বিস্ফোরণের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ছিলেন দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি, ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামি, প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই এবং পুলিশ প্রধান আহমেদ রেজা রাদান।
বিস্ফোরণের পরও মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন প্রধান বিচারপতি মোহসেনি-এজেই। তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও হামলার মধ্যেও ইরান পিছিয়ে যাবে না।
আল-কুদস দিবসের সূচনা হয় ১৯৭৯ সালে। ইরানি বিপ্লবের নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি রমজানের শেষ শুক্রবারকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। ধারণাটি প্রথম উত্থাপন করেছিলেন ইরানের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইব্রাহিম ইয়াজদি। এরপর থেকেই প্রতিবছর ইরানসহ বিশ্বের বহু দেশে এই দিবস পালিত হচ্ছে।
সময়ের সঙ্গে আল-কুদস দিবস মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। লেবাননে হিযবুল্লাহ সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করে। গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হামাস এবং প্যালেস্টাইন ইসলামিক জিহাদ সমাবেশ আয়োজন করে।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরেও প্রতিবছর মিছিল দেখা যায়। লন্ডন, বার্লিন, প্যারিস, স্টকহোম ও টরন্টোতে বহু মানুষ এতে অংশ নেন। তবে এই কর্মসূচি পশ্চিমা দেশগুলোতে বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। অনেক সরকার ও বিশ্লেষক এই বিক্ষোভকে ইসরায়েলবিরোধী তীব্র স্লোগান ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সমালোচনা করে থাকেন।
২০২৬ সালে যুক্তরাজ্য সরকার লন্ডনে আল-কুদস দিবসের মিছিল নিষিদ্ধ করে। পুলিশের ভাষ্য, এ ধরনের সমাবেশে গুরুতর জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের ঝুঁকি রয়েছে। ব্রিটিশ এক বিচারমন্ত্রী বলেছেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলোর প্রতি সমর্থন প্রকাশ যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
ইরানের ভেতরেও এই দিবস নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনেক তরুণ ইরানি আল-কুদস দিবসে অংশ নিলেও ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ মনে করেন আরব-ইসরায়েল সংঘাত তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার তুলনায় দূরের বিষয়। ২০২৪ সালের একটি জরিপে দেখা যায়, কিছু নাগরিক এই অনুষ্ঠানকে দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন বলেও মনে করেন।
তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনেক ইরানির মধ্যে নতুন ধরনের ঐক্যের অনুভূতি দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মুখে রাজধানীতে সমবেত মানুষেরা বিস্ফোরণের পর “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।
এদিকে সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়ছে। ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
ফেরদৌসি স্কয়ারের বিস্ফোরণের ধোঁয়া তখনও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। তবুও অনেক বিক্ষোভকারী মিছিল ছেড়ে যাননি। পুলিশ প্রধান রাদান বলেন, জনগণ আজ রাস্তায় নেমেছে শত্রুকে জানাতে—তারা ভয় পায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আল-কুদস দিবস কেবল ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির কর্মসূচি ছিল না। এটি ছিল যুদ্ধের সময়ে ইরানের রাজনৈতিক বার্তা ও জনসমর্থনের প্রদর্শন।
বিস্ফোরণ, সামরিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও তেহরানের রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে—এই দিবস এখন শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং একটি প্রতীকী অবস্থানও।
তথ্যসূত্র: Associated Press, PBS NewsHour, The Jerusalem Post, Turkiye Today, Wikipedia