মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও জ্বালানি পরিবহন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইঙ্গিত দেখা গেল। ইরান দুটি ভারতীয় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ট্যাঙ্কারকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরে চলমান উত্তেজনার মাঝেও এই সিদ্ধান্তকে অনেক বিশ্লেষক একটি বাস্তববাদী কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনী নিহত হন । এরপর তেহরান পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ শুরু করে এবং পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে যায়। আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৪টি জাহাজ এই পথ দিয়ে যেত, এখন তা কমে ১০টিরও নিচে নেমে এসেছে বলে আন্তর্জাতিক শিপিং পর্যবেক্ষকদের তথ্য।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়।
প্রতিবছর প্রায় ৮০ মিলিয়ন টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়। এর বড় অংশই পৌঁছে এশিয়ার বাজারে—বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়।
এই কারণে প্রণালীতে অস্থিরতা দেখা দিলে তা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। দেশটির তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে এবং এর বেশিরভাগ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রায় ৩৭টি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ এবং এক হাজারের বেশি নাবিক ওই অঞ্চলের আশেপাশে আটকা পড়ে বলে ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান।
১২ মার্চ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। একটি থাই জাহাজে হামলার ঘটনার পর নয়াদিল্লি জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।
১৩ মার্চ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই দুটি ভারতীয় এলপিজি ট্যাঙ্কারকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে দ্য ইকোনমিক টাইমস।
তবে একজন ইরানি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্স-কে বলেন, দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক “নিরাপদ চলাচল” চুক্তি হয়নি।
ভারতে নিযুক্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধির দপ্তর থেকেও জানানো হয়েছে, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালী বন্ধ করেনি। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলছে।
প্রথমত, ইরান পুরো প্রণালী বন্ধ করার পথে না গিয়ে বেছে বেছে কিছু দেশের জাহাজকে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে। এতে চাপ বজায় রেখেও সম্পূর্ণ সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো—যেমন ভারত বা চীন—নিজেদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আলাদা কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারে।
তৃতীয়ত, অনিশ্চয়তা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। ইরানের কিছু কর্মকর্তার সতর্কবার্তা অনুযায়ী, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, সামরিক নৌবাহিনীর এসকর্ট ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া কঠিন হবে। এ নিয়ে ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চলছে।
তবে হরমুজ প্রণালীর মতো সংকীর্ণ জলপথে সামরিক এসকর্ট পরিচালনা করাও সহজ নয়।
ফলে ইরানের এই সীমিত অনুমতি আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা বলেই মনে করা হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়বে।