টাঙ্গাইলে অসহায় পুনর্বাসন সংস্থার আয়োজনে এক পশলা প্রশান্তি

 

জাকির হোসেন

আকাশে ঈদের চাঁদ ওঠার আগেই টাঙ্গাইলে যেন মর্ত্যের চাঁদ নেমে এসেছিল। তবে সেই চাঁদ আকাশে নয়, ছিল মানুষের হৃদয়ে। বাংলাদেশ অক্ষম এবং অসহায় পুনর্বাসন সংস্থার আয়োজনে এক অদ্ভুত সুন্দর দুপুর পার করল টাঙ্গাইলবাসী। যেখানে অন্ধ, পঙ্গু, বধির আর বিধবাদের ভিড়ে মিশে গিয়েছিল একরাশ মমতা।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন টাঙ্গাইলের কৃতি সন্তান মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। দেখে মনে হলো, ক্ষমতার কোনো দম্ভ তাকে স্পর্শ করেনি। তার হাঁটাচলা, কথা বলা আর মানুষের দিকে তাকানোর মধ্যে এমন এক মায়াবী বিনয় ছিল, যা দেখলে মনে হয়—পৃথিবীতে এখনো কিছু মানুষ অন্যের দুঃখ নিজের কাঁধে তুলে নিতে জানে।

সবচেয়ে হাহাকার জাগানিয়া আর একইসাথে মুগ্ধকর দৃশ্যটি তৈরি হলো খাম বিতরণের সময়। উঁচু স্টেজে উঠে খাম নেওয়া পঙ্গু মানুষগুলোর জন্য খুব কষ্টের ছিল। মন্ত্রী মহোদয় বিষয়টি লক্ষ্য করলেন। তিনি মুহূর্তকাল দেরি না করে নিজেই স্টেজ থেকে নেমে এলেন। নিচু হয়ে ধুলোবালিকে তুচ্ছ করে তিনি পঙ্গু মানুষগুলোর হাতে হাতে খামগুলো পৌঁছে দিচ্ছিলেন। একজন বোবা মানুষ যার জবান নেই, সে যখন প্রতিমন্ত্রীর হাত ধরে ইশারায় কিছু বলছিল, তখন মন্ত্রী মহোদয় যেভাবে নিচু হয়ে তার কথা শোনার চেষ্টা করছিলেন, তা দেখে উপস্থিত সবার চোখ ভিজে আসছিল। যারা কানে শোনে না কিংবা চোখে আলো দেখে না, তাদের মুখেও ফুটে উঠেছিল এক চিলতে হাসি। একজন অন্ধ বৃদ্ধ ফিসফিস করে বলছিলেন, “বাপরে, হাতটা ধরতেই বুঝলাম মানুষটা বড় দয়ালু।” ক্ষমতার দম্ভ নয়, বরং মানুষের জন্য ভালোবাসা যে কত বড় শক্তি হতে পারে, সালাউদ্দিন টুকু তা প্রমাণ করলেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মোঃ মাহমুদুল হক সানু। সভাপতিত্ব করেন সংস্থার সভাপতি মোঃ জাকির হোসেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা খন্দকার নিপুন হোসাইন, সুরের জাদুকর ফিরোজ আহম্মেদ বাচ্চু এবং সুফিয়া জাকির।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন অধ্যক্ষ মোঃ লুৎফর রহমান, অ্যাডভোকেট মোঃ মোবারক হোসেন আর শিল্পী ফিরোজ আহম্মেদ বাচ্চু কথা বলছিলেন, তখন হলরুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নূর মোহাম্মদ রাজ্য আর মাটির মা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মতিআরা মুক্তাও সেখানে উপস্থিত থেকে মানবতার এই মিছিলে শামিল হয়েছিলেন। সহকারী অধ্যাপক ও জেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান তুহীনের সঞ্চালনায় প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল জীবন্ত।

প্রতিমন্ত্রী মহোদয় যখন প্রত্যেক প্রতিবন্ধীর হাতে টাকার খাম দিচ্ছিলেন, তখন দৃশ্যটা কেবল অর্থ প্রদানের ছিল না; ওটা ছিল এক টুকরো ভরসা। অনুষ্ঠান শেষ হলো, কিন্তু মানুষের মনে যে রেশ রয়ে গেল তা ফুরাবার নয়।

‘বাংলাদেশ অক্ষম এবং অসহায় পুনর্বাসন সংস্থা’র এই নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা না থাকলে এমন মানবিক দৃশ্য হয়তো আমাদের চোখেই পড়ত না। তারা যেভাবে সমাজের এই অবহেলিত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে, তা সত্যিই অতুলনীয়। মানুষ মরে যায়, কিন্তু মানুষের রেখে যাওয়া এই ছোট ছোট মানবিক কর্মগুলো কখনো মরে না।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *